বিন্দুবিসর্গ অন্তিম পর্ব

দেবতোষ দাশ

শেষমেশ লালবাজারের সাইবার ক্রাইম সেল খুঁজে পায় সেই মোবাইলের অবস্থান। লালবাগ। মুর্শিদাবাদ।

লালবাগ? লালগোলা নয়!

আপাতত লালবাগেই সেলটির স্থির অবস্থান। রজত ছকটা বুঝতে চায়। অন্তত এইটা বোঝা গেল নীলকণ্ঠের কাছে সলিড ইনফো আছে। কবীরের বাড়ি হতে পারে লালবাগ। নিজের বাড়ির নিরাপত্তার চৌহদ্দির মধ্যেই ঢুকতে চাইছেন কবীর।

কিন্তু তার পুরনো বন্ধু, একদা সহপাঠি তাকে মারতে চায় – এটা কি অনুমান করতে পারছেন কবীর ?

সম্ভবত কবীর বা নিবেদিতা কেউই জানেন না খুনির পরিচয়, জানলে পুলিশের সাহায্যই নিতেন। আততায়ী অজ্ঞাত বলেই আতঙ্ক গভীর।

আগেই একটা টিম রওনা দিয়েছিল মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে। তাদের কিছু নির্দেশ দেয় ফোনে। তারপর ফোন লালবাজারে। বিধাননগর কমিশনারাটে। বাছাই ফোর্স রেডি করতে বলে। লিড করবে সে নিজে। ডেস্টিনেশনঃ আপাতত লালবাগ, মুর্শিদাবাদ।

মুর্শিদাবাদ এসপির সঙ্গেও কথা হয়। লোকাল পুলিশের সাহায্য দরকার।

তারপর কথা বলে ড্রাইভার প্রদীপের সঙ্গে। নিবেদিতার ফ্ল্যাটে বসেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে নেয়। ঘড়ি দেখে। প্রায় নটা।

হঠাৎ গৌরাঙ্গ বলে বসে,

স্যার আমি যাব –

যাবেন?’ রজত গৌরাঙ্গের চোখে চোখ রাখে।

হ্যাঁ, স্যার – প্লিজ স্যার –

হুঁ, আপনাকে দরকার – আরেকটা গাড়ি আসছে , ওটায় উঠবেন – গেট রেডি –

থ্যাঙ্ক ইয়ু স্যার!’

কিন্তু এখনও একটা চিন্তা থেকে যাচ্ছে।

ডিকে কোথায়? কোথায় উধাও হয়ে গেল?

বই আকারে প্রকাশিত হতে চলেছে পত্রভারতী থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০১৭।  প্রকাশকের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষপর্ব চলে গেল কেবল বইয়ের পাতায়। পাঠক নিশ্চয়ই আমায় মার্জনা করবেন।

[বিন্দুবিসর্গ একটি ফিকশন। বিকল্প ভাবনার দার্শনিক কলিম খান ও তাঁর সহযোগী রবি চক্রবর্তীর গবেষণালব্ধ ভাবনার কিয়দংশ এই কাহিনীতে ব্যবহৃত। ভাষাতত্ত্ব ও ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তাঁদের বিকল্প ডিসকোর্স, এই কাহিনীর মূল উপজীব্য। উপন্যাসে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে মতের মিল অনেকের নাই হতে পারে, সেক্ষেত্রে পাঠকের কাছে একটাই অনুরোধ, লেখাটি একটি ফিকশন, কল্পিত কাহিনী হিসেবেই বিন্দুবিসর্গএর পাঠ কাঙ্ক্ষিত। অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাহিনী নির্মিত নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখিত হয়েছে কাহিনীর প্রয়োজনে। এই কাহিনীতে নির্মিত কাল্পনিক চরিত্র/গোষ্ঠী/মতবাদের সঙ্গে বাস্তবের কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতবাদের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলে তা নিতান্তই কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত। দেবতোষ দাশ]

Advertisements

বিন্দুবিসর্গ পর্ব ১৭

দেবতোষ দাশ

‘ … সূর্য্য যেহেতু নিজের আলোয় আলোকিত, তাই সূর্য্যবংশীরা সব ঔরসজাত। চন্দ্রের নিজের আলো নেই, অন্যের আলোয় আলোকিত, তাই চন্দ্রবংশীরা সবাই ক্ষেত্রজ।

কৌরবরা ঔরসজাত। পাণ্ডবরা সবাই ক্ষেত্রজ। ধৃতরাষ্ট্রের একশো এক সন্তান কিন্তু পাণ্ডুর ঔরসে কোনও সন্তান হওয়ার উপায় নেই। তাই ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদের ঔরসে কুন্তী ও মাদ্রীর গর্ভে জন্মাল পাঁচ ক্ষেত্রজ পুত্র। যুধিষ্ঠির ভীম অর্জ্জুন নকুল ও সহদেব।

এখন প্রশ্ন হল, সামাজিক ক্ষমতা পাবে কারা? ঔরসজাত পুত্রেরা না ক্ষেত্রজ পুত্রেরা? রাষ্ট্রীয়পুঁজির সমর্থক কৌরবরা না ব্যক্তিপুঁজির সমর্থক পাণ্ডবরা?

দুটি ধারা এবার দাঁড়ায় মুখোমুখি। বৈদিক সভ্যতা ছিল পণ্যজীবীদের বিরুদ্ধে। পাণ্ডবদের অর্থাৎ পণ্যজীবীদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে নানা সৎ ও অসদুপায় নেওয়া হয়।

সেই বিশাল বিশাল সামাজিক ঘটনাগুলোকে জতুগৃহ দাহ থেকে শুরু করে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাহিনীর মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে মহাভারতে।

শেষে শুরু হল মহাসংগ্রাম। এই যুদ্ধের ফলাফল হয় সাংঘাতিক। সুদূরপ্রসারী। উভয়েই উভয়কে মেরে প্রায় নিকেশ করে ফেলে।

রাষ্ট্রীয়পুঁজির সমর্থক কৌরবদের শেষ করে ফেলেও শেষরক্ষা করতে পারে না ব্যক্তিপুঁজির সমর্থক পাণ্ডবরা।

এই ধনতন্ত্রবাদী পাণ্ডবরা নির্মূল হয়ে ভারত ত্যাগ করতে অর্থাৎ মহাপ্রস্থানে যেতে বাধ্য হয়। ঘটে যায় কৃষ্ণহত্যাও। বলা যেতে পারে, সাড়ে সাতশো খ্রীস্টাব্দে ভারতের পুঁজিবাদী সত্তার মহাপ্রস্থান ঘটল।

তারপর বিদেশের নানা দেশ ঘুরে নতুন বলে বলীয়ান হয়ে নারায়ণ আবার ভারতবর্ষে ঢুকলেন ১৭৫৭, ইংরেজের হাত ধরে।

আমরা এই মুহূর্তে আছি সেই জায়গায়, মুর্শিদাবাদ, এখানেই ভারতের স্বাধীনতাকে ডুবিয়ে আসল রাজ শুরু করে বিদেশী পুঁজিবাদী প্রভু। বর্তমানে অবশ্য গোটা বিশ্বই নারায়ণের কন্ট্রোলে।

যাইহোক, যা বলছিলাম, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ভারতের ক্ষত্রিয়রা প্রায় নির্মূল। শঙ্করাচার্যরা বেদবিরোধী যুগের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু যুগের। ব্রাহ্মণের আধিপত্য আবার ফিরে আসে।

বিজয় ঘোষণা করা হয় ব্যবসাবিরোধী মানসিকতার। সমুদ্রযাত্রা বা কালাপানি পেরোনো হয় নিষিদ্ধ। সর্বপ্রকারের পণ্য রপ্তানী বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এক কথায় পুঁজির বিকাশের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। আবার সুপ্রতিষ্ঠিত হয় বৈদিক সভ্যতা। এটাই হিন্দুযুগ। এই প্রতিক্রিয়ার গল্পই মহাভারতের।

কিন্তু কেমন ছিল সে প্রতিক্রিয়া?

ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে আমার বইয়ের গুরুত্ব। গুহ্যতত্ত্বও বলতে পার। যে রহস্যের ভেদ এতদিন কেউ করতে পারেনি, আমার লেখায় আছে সেই উত্তর।

গুহ্যতত্ত্ব? কী গোপন কথা আছে কবীরের পাণ্ডুলিপিতে।

বাকরুদ্ধ ডিকে তাকিয়ে থাকে কবীরের দিকে।

মার্জনা করবেন পাঠক। বই আকারে বিন্দুবিসর্গ প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা বইমেলা ২০১৭তে। প্রকাশকের ইচ্ছেকে সম্মান দিয়ে বাকি অংশ রইল কেবল বইয়ের পাতায়। প্রকাশকঃ পত্রভারতী

[বিন্দুবিসর্গ একটি ফিকশন। বিকল্প ভাবনার দার্শনিক কলিম খান ও তাঁর সহযোগী রবি চক্রবর্তীর গবেষণালব্ধ ভাবনার কিয়দংশ এই কাহিনীতে ব্যবহৃত। ভাষাতত্ত্ব ও ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তাঁদের বিকল্প ডিসকোর্স, এই কাহিনীর মূল উপজীব্য। উপন্যাসে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে মতের মিল অনেকের নাই হতে পারে, সেক্ষেত্রে পাঠকের কাছে একটাই অনুরোধ, লেখাটি একটি ফিকশন, কল্পিত কাহিনী হিসেবেই বিন্দুবিসর্গএর পাঠ কাঙ্ক্ষিত। অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাহিনী নির্মিত নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখিত হয়েছে কাহিনীর প্রয়োজনে। এই কাহিনীতে নির্মিত কাল্পনিক চরিত্র/গোষ্ঠী/মতবাদের সঙ্গে বাস্তবের কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতবাদের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলে তা নিতান্তই কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত। দেবতোষ দাশ]

বিন্দুবিসর্গ পর্ব ১৬

দেবতোষ দাশ

… ‘আচ্ছা আপনাদের অদ্বৈত নামে কোনো কমন ফ্রেন্ড আছে?’

আমাদের মানে!’

মানে বলতে চাইছি আপনাদের কোনো ক্লাসফ্রেন্ড বা অন্য বন্ধুর নাম অদ্বৈত? ‘

অদ্বৈত? এমন নাম তো কখনও শুনিনি – কীরে খান , শুনেছিস এমন নাম? কিন্তু হঠাৎ অদ্বৈত কোত্থেকে এল ধরণীবাবু?’

না, আসলে টিভিতে দেখলাম ওনার চেম্বারে রাত বারোটা নাগাদ একজন গেস্ট ছিলেন, নাম অদ্বৈত – উনি চলে যাওয়ার পরই নাকি বিলুবাবুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় –

তাই নাকি! আসলে খবরটা পেয়েই টিভি অফ করে দিয়েছিলাম – ডিটেলটা আর শোনা হয়নি – ইচ্ছে হয়নি – অদ্বৈত নামক গেস্ট! ইন্টারেস্টিং! আসলে কী জানেন, বিলু ছিল অসম্ভব অ্যাম্বিশাস, পাওয়ার মঙ্গার। তাই ও অ্যাকাডেমিকস্‌এ আসেনি। মিডিয়াই বেছে নিয়েছিল। ও যে ওর পথে ঠিক ছিল তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মিডিয়ার মতো পাওয়ারফুল আর কিছু নেই। বিলুও ছিল যথেষ্ট পাওয়ারফুল। তাছাড়া মিডিয়ায় অত পণ্ডিত মানুষ কোথায়? বিলুর আর্টকেলগুলো পড়েন?’

নিয়মিত।ডিকের দ্রুত জবাব।

ইংরেজি?’

বাংলা, ইংরেজি বোথ। সিম্পলি অসাধারণ!’

আমিও তাই মনে করি। যাইহোক, ওই পাওয়ার পলিটিক্স থেকেই শত্রুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ে। বিলু ওই ধরণের কিছুরই শিকার বলে আমার ধারণা। তবে সিওর নই। দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। তুই কী বলিস কবীর?’

বলব ধীরেসুস্থে বলব, চল আমার বাড়ি। তবে কাল ফেরা চলবে না – দু চারদিন থাক – অ্যাদ্দিন পর দেখা – তোকে পেয়ে আমি বিলুর শোকে কিঞ্চিৎ প্রলেপ যেন দিতে পারছি।কবীরের মুখে প্রশান্তি।

ধীরেসুস্থে বলবি মানে, তুই কিছু জানিস?

নীলকণ্ঠ চোখেমুখে উদ্বেগ ও কৌতুহল মাখায়।

৮৭

তোর সঙ্গে ওর যোগাযোগ ছিল বিলুর?’ নীলকণ্ঠ যেন ধৈর্য রাখতে পারে না।

বহুবছর পর ইদানিং আবার যোগাযোগ হয়েছিল – সে অনেক গল্প –

তোর পথ আর মিডিয়ার পথ তো আলাদা রে!’ মিটিমিটি হাসি নীলকণ্ঠর।

ক্ষমতার মূল উৎস কী? দাপের বাপ কে?’ কবীরের প্রশ্ন।

ডিকে শ্রোতা।

মিডিয়া বুঝি?’ নীলকণ্ঠ হেসে বলে।

না, ওই বস্তুটির নাম আসলে সত্যগোপন।উত্তর দেন কবীর।

সেন্সর?’ আবার হেসেই বলে নীলকণ্ঠ।

একদম ঠিক বলেছিস! তাই রাষ্ট্র সিনেমা সেন্সর করে, বই নিষিদ্ধ করে। তাই তারা মিডিয়ার ওপর ক্ষ্যাপা। সত্য প্রকাশের অপরাধএর জন্য তাই যত দোষ মিডিয়া ঘোষ।

তাই মিডিয়ার সাত খুন মাফ!’ নীলকণ্ঠের কণ্ঠে ব্যঙ্গ।

মিডিয়াকে তুই কি হালকাভাবে দেখিস নীলু? এর প্রাচীন ইতিহাস আছে।

তুই নিশ্চয়ই মহাভারতের সঞ্জয়ের কথা বলবি?’ নীলকণ্ঠ হাসে।

কবীরের দৃষ্টি জানালা দিয়ে আবার নিষ্পলক। ট্রেন ছুটছে দ্রুত। দৃষ্টি পিছলে যায় অন্ধকারে। নজরে আসে না কিছুই। চোখ ফেরান কবীর। স্মিত হাসেন নীলকণ্ঠের দিকে তাকিয়ে।

আমাদের ভাষায় খবর ছড়ায় বাতাসে, তাই ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে বায়ুই আদি মিডিয়া।

বায়ু মিডিয়া?’ ডিকে বিরতি ভাঙে।

কোনো কিছু হওয়ার খবর সে বয়ে নিয়ে যায় বলে তার নাম হাওয়া। সেকালে সম ঈরণের খবর সে নিয়ে যেত বলে তার আর এক নাম সমীরণ।

ঈরণ মানে?’ আবার ডিকে।

নীলকণ্ঠ চুপ।

সমান ভাগ পাওয়া।

উৎপন্নের?’

হ্যাঁ। আদিম সাম্যবাদী সমাজে তাই হত। ওই ঈরণ, +ইর শব্দটি থেকেই ইংরেজি AIR, A+IR তৈরি হয়েছে।

খান, এটা কীভাবে বলছিস? স্রেফ অনুমান?’

নীলকণ্ঠের কথায় কবীর স্মিত। যেন জানতেন এমনটাই বলতে পারে সে। উত্তেজিত হন না। ধীরে ধীরেই বলেন,

সম্‌ যুক্ত অ যুক্ত ঈর যুক্ত অণ, এখানে অ মানে A আর ঈর হচ্ছে IR – এয়ার আরে বলব, সব বলব তোকে, তুই আমার পুরাতন দোস্ত। সন্ধান পেয়ে গেছি।কিছুটা গদগদ ভঙ্গিতেই বলেন কবীর।

কী পেয়েছিস?’ উৎসুক নীলকণ্ঠ।

পুরাণ পাঠের চাবিকাঠি। ক্রমশ প্রকাশ্য। সব বলব।

হাসেন কবীর। ডিকে ছাড়তে পারে না মিডিয়াকে। যেন জানতে তাকে হবেই।

কবীরদা মিডিয়ার ব্যাপারটা কী বলছিলেন?’

হ্যাঁ আদি মিডিয়া সেকালে কোনো হস্তশিল্পজাত পণ্যকে মল বলা হত। ভারতে ব্যক্তিমালিকানা নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় মল শব্দটি নোংরা হয়ে যায়। তাই একে গুও বলা হত। যা থেকে পরে গুডস্‌ কথাটি এসেছে।

তাহলে কি কবীরদা এখন যে শপিং মলএর মল, সেটাও পণ্য কেনাবেচার জায়গা বলেই তাকে মল বলে?’ ডিকের অতি উৎসাহী জিজ্ঞাসা।

ওটা আমেরিকান ইংরেজি শব্দ। ওর জিনআর্কিওলজি চর্চা করলে ইতিহাস পাওয়া যেতে পারে।

হ্যাঁ সেই মল কী হল?’ নীলকণ্ঠ শুনতে চায়।

কোনো স্থানে ব্যক্তিমালিকানাধীন পণ্য অর্থাৎ প্রচুর পরিমাণে মল উৎপাদিত হলে এবং সে খবর বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে, সে বাতাসকে বলা হত মলয়।

বায়ুর তো অজস্র নাম!’ ডিকে বলে।

মিডিয়ার এইরকম ৪৯টি রূপ দেখতে পেয়ে সেকালের ভারতীয়রা এর নাম দিয়েছিলেন ৪৯ বায়ু।

৪৯ বায়ুর কথা ডিকের শোনা। কিন্তু ৪৯টা রূপের সবগুলোর নাম জানা নেই।

পত্রিকার নামও ৪৯ বায়ু, যেখানে কবীর খান বহু বছর আগে লিখতেন। পত্রিকার নাম এমন হওয়াটা খুব মজার। পত্রিকা তো মিডিয়াই। যিনি নাম দিয়েছেন রসিক বটে।

সবসময় কি বায়ু বা মিডিয়া এত পাওয়ারফুল ছিল?’ নীলকণ্ঠ আবার জিজ্ঞাসু।

পুরাণ মতে, যৌথতা বা একাকারের যুগ পেরিয়ে সমাজ সত্যযুগে পা রাখলেই বায়ুর প্রকোপ প্রশমিত হয়ে যায়। ত্রেতা, দ্বাপর বা কলিতে আরও প্রশমিত। কিন্তু একাকারের যুগ পুনরায় সমাগত হলে বায়ুর প্রকোপ বেড়ে যায়। সম্প্রতি বিশ্বায়নের যুগে ঘটে গেছে সেটাই। সব আবার একাকার হয়ে গেছে। ফলত প্রকোপ বেড়েছে মিডিয়ার। রাইট টু ইনফর্মেশন ভারতেও সাংবিধানিক স্বীকৃত পেয়েছে।

গোপনীয়তার নেই মালিকানা!’ ডিকে মৃদু হেসে বলে।

রাষ্ট্র তাই বিপদে। ক্ষমতার মূল উৎস সত্যগোপন এখন আর খুব সহজ নয়। তাই মিডিয়াকে কব্জা করতে রাষ্ট্র তাই উঠে পড়ে লেগেছে।

কবীর স্বভাবসিদ্ধ শান্ত ভঙ্গিমায় অথচ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলে চলেন তার কথা।

এখন কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে মিডিয়াকে।ডিকে বলে।

কিন্তু এর বাইরেও মিডিয়া আছে। সত্য তুমি চেপে রাখতে পারবে না। দেখছ না, উইকিলিক্স এসে সব গুপ্ত সরকারি খবর কেমন ফাঁস করল আর আমেরিকাসহ বড় বড় দেশের হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ? আর তো কিছু করতে পারল না সে! লুকিয়ে আছে!’ নীলকণ্ঠ বলে।

আরও অসংখ্য জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বা এডওয়ার্ড স্নোডেনের জন্ম দেবে আগামী পৃথিবী। অসংখ্য হ্যাকারের জন্ম দেবে! সত্যগোপন আর সহজ হবে না নীলু! আগামী বিশ্বে রাষ্ট্রের মূল প্রশ্ন ও চিন্তা এটাই – কী করে তারা গোপন করবে সত্য!’

নীলকণ্ঠ হাসে। ঘড়ি দেখে।

বহরমপুর ঢোকার সময় হল। দ্রুত ব্যাগ থেকে একটা টুপি আর চাদর বার করে।

একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছেবলে হাসি মুখে টুপিটা মাথায় আর গায়ে চাদরটা চাপায়।

নিবেদিতা কবীরকে ব্যাগ থেকে চাদর বার করে দেয়। কবীরও গায়ে চাপিয়ে নেন চাদর।

ন্যাশানাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি পেছনে পড়ার পর থেকেই নীলকণ্ঠ এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকে না। বহরমপুর ঢোকার আগে সে কামরা পরিবর্তনের লক্ষে বেলডাঙা স্টেশনকেই বেছে নেয়।

গাড়ি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর কারণেই পায়চারি করছিল প্ল্যাটফর্মে। হঠাৎ চোখে পড়ে কবীরকে। প্রায় ভুত দেখার মতো চমকায়। একি, যার খোঁজে তার লালগোলা পাড়ি, সে নাগালে দাঁড়িয়ে। সামান্য ধাতস্থ হয়ে এগোয় কবীরের দিকে।

আরও দুই নারীপুরুষকে কবীরের সঙ্গে আশা না করলেও, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে সে জানে।

বহরমপুর ঢোকার আগে টুপি আর চাদরের ব্যবহারে চেহারা কিছুটা আড়াল করে। বস্তুত আইবির খোচরদের গায়ে নিয়েই, চলা অভ্যাস হয়ে গেছে নীলকণ্ঠের।

তাছাড়া নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায় হিসেবে তাকে ধরা কার্যত অসম্ভব। মহারাষ্ট্র এটিএস আর এনআইএএর ঘাগু গোয়েন্দারা অনেক কেস দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোনোটাই প্রমাণ করতে পারেনি।

কাজে পরিকল্পনা ও অতিরিক্ত সতর্কতা রাখে বলে প্রমাণ বের করা শক্ত। তাছাড়া আজ পর্যন্ত কোন অ্যাকশনেই সে নিজে সরাসরি জড়ায়নি।

মালেগাঁও কেসে সেনাবাহিনীর যে প্রাক্তন কর্মী সুরেশ উপাধ্যায়ের সাহায্যে অপারেশনটা সাজানো হয়েছিল তার সঙ্গেও নীলকণ্ঠ দেখা করেনি। দেখা করেছিল অদ্বৈতর মতোই কেউ একজন যার সঙ্গে নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের কোনো বাহ্যিক মিল নেই।

তবুও সুরেশের থেকে নীলকণ্ঠের নাম কী করে অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড পেল এটা রহস্য। তার ধারণা সুরেশের থেকে নাম পায়নি এটিএস ওটা এটিএসএর চাল। এসএসএর কার্যকলাপ সম্পর্কে তারা ভালভাবেই অবহিত।

কিন্তু হাতে প্রমাণ নেই। তাই গুরুত্বপূর্ণ সেনাপ্রমুখ হিসেবে নীলকণ্ঠকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসএসকে চাপে রাখাই ছিল ওই জেরার মূল উদ্দেশ্য।

এটিএস তাকে জেরা করে ছেড়ে দিয়েছে আর পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে এজেন্ট

এই মুহূর্তে নীলকণ্ঠের আড়ালের তেমন দরকার নেই। আড়ালের দরকার অদ্বৈতর এবং আপাতত অদ্বৈত অদৃশ্য।

তবুও মাঝে মধ্যে হালকা একটা টেনশন হয় আর তার তাড়নাতেই আরও কিছুটা সাবধানী হয় নীলকণ্ঠ।

গলায় কলারটা দেওয়ার উদ্দেশ্যও তাই।

অথচ সহকর্মী দুই সেনাপ্রমুখ তার ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখে তাকে রোমান্টিক বলে। নীলকণ্ঠ হাসে মনে মনে।

আর দ্রুত মাথায় সাজিয়ে নেয় পরবর্তী পরিকল্পনা।

এই প্রথম সরাসরি অপারেশনের পরিকল্পনা ও প্রয়োগে সে নিজে। এতদিন ছিল কেবল পরিকল্পনায়, আজ সরাসরি অ্যাকশনে।

প্রথমটি সফল। পরিকল্পনার নিখুঁত প্রয়োগ। এবার দ্বিতীয়।

ট্রেন বহরমপুর ঢোকে।

৮৮

সতর্ক ও সন্ধানী দৃষ্টি ডিকেরও। রজত তাকে ভরসা করে। সিসি টিভিতে দেখা অদ্বৈতর মুখচ্ছবিতে দিল্লির রিপোর্টে পাঠানো নীলকণ্ঠের মুখের ছায়া দেখে রজত। চোখ আর চিবুকের মিল তাকে সন্ধানী করে। ডিকের চোখেও এই মিল ধরা না পড়ার কোনো কারণ ছিল না, কিন্তু বাদ সাধে নীলকণ্ঠের অতিরিক্ত সাবধানতা।

মোটা কালো ফ্রেমের চশমা আর কলার, চোখ আর চিবুকের সংকেত পাঠায় না ডিকেকে।

রজত যে ছবি দেখেছে, তা দিল্লির এমএইচএ (মিনিস্ট্রি অফ হোম অ্যাফেয়ার্স)-এর পাঠানো। চশমা ও গলাবন্ধহীন নীলকণ্ঠের আসলি ছবি।

যে নীলকণ্ঠকে ডিকে দেখছে, সে সাবধানতার সঙ্গে অদ্বৈতকে অদৃশ্য করে দিতে বেশ ও কেশসহ চালচলনের সতর্ক বদল ঘটিয়েছে। অদ্বৈতর ঋজু ও স্মার্ট চলন উধাও করে দিয়ে নিজের ওপর কিছুটা বয়স আরোপ করেছে নীলকণ্ঠ। স্লথ করেছে হাবভাব। চালচলন।

ফলত ডিকের সতর্ক চোখকে নাজেনেই ফাঁকি দিতে পেরেছে নীলকণ্ঠ।

কিন্তু নিবেদিতা? তার চোখে কি ফাঁকি দিতে পেরেছে নীলকণ্ঠ?

সিসি টিভিতে অদ্বৈতকে সে দেখেনি। ফলত অদ্বৈতর সঙ্গে কোনো মিল খোঁজার ব্যাপার নেই তার ক্ষেত্রে।

কিন্তু নীলকন্ঠকে মোটেই সহজভাবে নিতে পারে না নিবেদিতা।

ট্রেন বহরমপুর ছাড়ে। নীলকণ্ঠ আর কবীরের মুখে রাজ্যের কথা, রাজ্যের স্মৃতি। ডিকে শ্রোতা। নিবেদিতাও।

মুক্তিযুদ্ধের কথা যেমন বলতিস, তেমন তোর মুর্শিদাবাদের কথাও – ভাস্কর পণ্ডিত – মনে আছে খান ?’

তুই এখন সেই ভাস্কর পণ্ডিতের দেশের লোক!’ কবীর হাসেন।

তাই বলে আমি বর্গি নই!’ বলেই নীলকণ্ঠ হাহা করে হেসে ওঠে। বাকিরাও।

কবীরদা নগদ নারায়ণই শেষ হল না, আরও কত গল্প জমা হচ্ছে – মুক্তিযুদ্ধ , ভাস্কর পণ্ডিত।ডিকের আক্ষেপ।

হাসেন কবীর। তাকান নিবেদিতার দিকে।

নিবেদিতা তুমি বর্গি ব্যাপারটা জান?’ কবীরের প্রশ্ন।

ছেলে ঘুমলো পাড়া জুড়লো বর্গি এল দেশে / বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?’ নিবেদিতা হেসে বলে

এই বর্গিদের অত্যাচারে বাংলার মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত ছিল একসময়। মারাঠা বর্গিরা ঘোড়ায় চড়ায় ছিল অত্যন্ত পারদর্শী। দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ারেরা সেই নাগপুর, বিদর্ভ অঞ্চল থেকে বাংলায় এসে লুটপাঠ করে চলে যেত। তাদের মুখে ছিল একটাই কথা – রূপি দেহ , রূপি দেহ! রূপি না পেলে তারা তুমুল অত্যাচার চালাত। মহারাষ্ট্র পুরাণে এর বিবরণ আছে। এই দস্যু দলের নেতা ছিল ভাস্কর পণ্ডিত।

বাংলা সবসময়ই একটা সফট্‌ টার্গেট!’ ডিকের সংযোজন।

কলকাতা শহর হিসেবে গড়ে ওঠার বা গুরুত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বর্গিদের কিন্তু একটা পরোক্ষ ভূমিকা আছে জানেন তো ধরণীবাবু?’

নীলকণ্ঠ ডিকের দিকে তাকায়। তারপর নিবেদিতার দিকে।

কীরকম?’ ডিকের জিজ্ঞাসা।

নতুন বিষয়ের গন্ধ পায় তার অনুসন্ধিৎসা। নিবেদিতারও উৎসাহী দৃষ্টি নীলকণ্ঠের দিকে।

এইটিন্থ সেঞ্চুরির গোড়ায় কলকাতায় লোকসংখ্যা কত ছিল ধারণা আছে?’

নিবেদিতা ও ডিকের দিকে চোখ রেখেই প্রশ করে নীলকণ্ঠ।

১৬৯০এ জব চার্নক কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর তিনটে মৌজা নিয়ে শহর পত্তন করলেন – দশ বিশ বছরের মধ্যে খুব বেশি লোক থাকার কথা নয়ডিকের জবাব।

একদম ঠিক। মাত্র পনেরো হাজার।নীলকণ্ঠ সপ্রশংস তাকায় ডিকের দিকে।

কলকাতার তখন কোনো গুরুত্বই ছিল না।কবীর বলেন।

কিন্তু বর্গি হাঙ্গামার মুখে পড়ে তখনকার রাজধানী মুর্শিদাবাদ ছেড়ে, মূলত অবস্থাপন্ন ধনী পরিবারগুলো দলে দলে কলকাতায় পাড়ি জমাল। নিমেষে কলকাতার জনসংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি হয়ে গেল। শহর মুর্শিদাবাদের জায়গায় মফস্বল কলকাতাই তখন সকলের নিরাপদ আশ্রয় হল। খানের মতো অনেক মুর্শিদাবাদীই বলে, অজগ্রাম কলকাতা বিরাট শহর হয়ে গেল স্রেফ বর্গিদের সৌজন্যে!’

বলেই মিটিমিটি হাসে নীলকণ্ঠ। আড়চোখে তাকায় কবীরের দিকে। কবীরও হাসেন বন্ধুর টিপ্পনিতে। স্বাভাবিক প্রবণতায় সংযোজন করেন আরও কিছু।

মুর্শিদাবাদ তো ছিলই বড় শহর, বাংলাবিহারউড়িষ্যার রাজধানী। এমনকি কৃষ্ণনগরও বিরাট শহর। নবদ্বীপ। সব শহর থেকেই কলকাতা যাত্রার হিড়িক পড়ল। কলকাতা তখন গ্রাম। বড়জোর মফস্বল বলা যেতে পারে। কিন্তু এ তো মিথ্যে নয় নীলু, ইতিহাসের কথা।

কবীরের অনুপ্রবেশে নীলকণ্ঠের আবার টিপ্পনি।

এই, দেখলেন খান লাইন পেয়ে গেল – সুযোগ পেলেই মুর্শিদাবাদের জয়গান – আরে সে তো দু শ বছর আগের কথা – এখন কী অবস্থা তোর মুর্শিদাবাদের?’

সকলেই হাসে। ডিকে খেয়াল করে নিবেদিতার মুখেও হাসি।

ট্রেন কাশিমবাজার দাঁড়ায়। নিবেদিতা কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলটা বার করে এগিয়ে দেয়। ডিকে বোতলটা ধরে। দুচুমুক খেয়ে নীলকণ্ঠের দিকে এগিয়ে দেয়। নীলকণ্ঠও ঠাণ্ডা পানীয়ে গলা ভেজায়। কবীরও খান সামান্য।

নিবেদিতা এক সিপ নিয়ে আবার ঢুকিয়ে দেয় বোতলটা ব্যাগে।

বর্গি হামলায় আরেকটা জিনিস হল নীলু – সেটা বল !’ অনিঃশেষ তর্কপ্রবণতায় কবীর আবার শুরু করেন।

কী রে?’

এই সুযোগে ইংরেজরা কলকাতার ঘাঁটি শক্ত করে নিল। পলাশীর ষড়যন্ত্রে যা তাদের সাহায্য করল। বর্গি হামলার ফলাফল বেশ সুদূরপ্রসারী নীলু –

ঠিক, একদম ঠিক। আচ্ছা নিবেদিতা, হাজারদুয়ারি দেখেছেন?’

হঠাৎ কথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয় নীলকণ্ঠ। তার প্রশ্নে নিবেদিতা নেতিবাচক মাথা নাড়ে।

নীলকণ্ঠ এবার ডিকের উদ্দেশে।

আপনি ধরণীবাবু?’

খুব ছোটবেলায় মাবাবার সঙ্গে এসেছিলাম। খুব কিছু মনে নেই –

তাহলে আমরা মুর্শিদাবাদে নেমে যেতে পারি – আজ রাতটা হোটেলে কাটিয়ে কাল হাজারদুয়ারিসহ অন্যান্য জায়গাগুলো দেখে তারপর বিকেলে বা সন্ধের দিকে কবীরের বাড়ি – কিরে খান তোর আপত্তি আছে ? আসলে হঠাৎ ইচ্ছেটা চাগাড় দিল –

আমার কোনো আপত্তি নেই, কী ধরণীবাবু, নিবেদিতা?’

আমি এক পায়ে খাড়া।ডিকের সহাস্য জবাব।

মুখ দেখে বোঝা যায়, নিবেদিতা এই প্রস্তাবে সহমত হতে পারছে না।

সকলে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

যাওয়া যেতে পারত, আপত্তি নেই কোন কিন্তু কবীরদার শরীরটা ভাল নেই – উনি মুখে উৎসাহ দেখাচ্ছেন বটে – আসলে ওনার বাড়িতে ফেরাটা বেশি জরুরী –

নিবেদিতার কথায় কবীর কিছুটা থতমত। নীলকণ্ঠ যেন কুণ্ঠিত।

ওহোহো, আমি বুঝিনি – খান তুই অসুস্থ ? ওকে, তাই চল, লালগোলাই চল –

আমি ঠিক আছি নিবেদিতা। তোমাদের যদি কোনো অসুবিধে থাকে আলাদা কথা, আমার কিন্তু কোনো সমস্যা নেই – বহুদিন আমারও মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ হয়নি – কাল আমরা ভ্রমণ সেরে লালগোলা ফিরব – দেখনি যখন এই সুযোগে দেখে নাও – ইতিহাসের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে – কেবল তো হাজারদুয়ারি নয় , ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, খোসবাগে সিরাজের সমাধি –

উনি সম্ভবত শিবরামের মতো ভ্রম বাড়লেই ভ্রমণ হয় তত্ত্বে বিশ্বাসী –

নীলকণ্ঠের কথায় বাকিরা হাসে। সব চোখ নিবেদিতার দিকে।

ঠিক হয় মুর্শিদাবাদেই নামা হবে।

ব্যাগ গুছিয়ে ফেলা হয় দ্রুত কারণ কাশিমবাজারের পরেই মুর্শিদাবাদ স্টেশন।

ডিকে কেবল খেয়াল করে নিমরাজি নিবেদিতার চোখেমুখে অস্বস্তির কাঁটা।

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে সাতটা। বাইরে অন্ধকার।

প্রাথমিক পরিকল্পনা খেটে যাওয়াতে নীলকণ্ঠ উল্লসিত।

মনে মনে সাজিয়ে ফেলে পরবর্তী ঘুঁটি।

৮৯

মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নেমে কবীর আর নীলকণ্ঠ গল্প করতে করতে এগোয়। পেছনে নিবেদিতা ও ডিকে। সুযোগ পেয়ে ডিকে প্রায় ফিসফিসিয়ে নিবেদিতাকে বলে,

নীলকণ্ঠকেও সন্দেহ করছেন? পুনে ইউনিভার্সিটির হিস্ট্রির রিডার –

তো, তাতে কী হল?’

আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে জগতের সবাই কবীর খানের শত্রু, এমনটা ভাবার কারণ?’

কাউকে বিশ্বাস করার প্রশ্নই নেই, কার খানদার বিপদ –

আমাকে এখনও সন্দেহ করার কারণ কী?’

আর কথা বাড়াবার সুযোগ হয় না। কবীর দাঁড়িয়ে পড়েছেন। কবীরের ব্যাগ নিবেদিতার কাঁধে।

আমায় দাও ব্যাগ – তোমার নিজের ব্যাগই বেশ ভারি

কোনো দরকার নেই – আমি ঠিক আছি – আপনি এগোন ।

নিবেদিতা কবীরকে হাত দেখিয়ে এগোতে বলে। কবীর আবার এগিয়ে যান।

বাইরে প্রচুর টাঙ্গা দাঁড়িয়ে। দুএকটা প্রাইভেট কার। এসইউভি। স্টেশন থেকে বেরোনোর মুখে নিবেদিতার নজর চলে যায় বেশ কয়েকটি বোর্ডের দিকে। দেওয়ালে ও গাছের গায়ে ঝোলানো। ভাড়া গাড়ির জন্য বিজ্ঞাপন। ফোন নাম্বার দেওয়া।

একটা টাঙ্গা নেওয়া হয়। ভাগীরথীর ধারে সবথেকে ভালো হোটেলে টাঙ্গাওয়ালাকে নিয়ে যেতে বলে নীলকণ্ঠ।

ঘোড়ার মল টপকে সকলে উঠে বসে টাঙ্গায়। ঘোড়াটা পিচঢালা রাস্তায় টগবগিয়ে ছোটে। গন্তব্য হোটেল বাদশা।

দুই বন্ধু পেছনে আর সামনে ডিকে ও নিবেদিতা।

হোটেলে গিয়ে নীলকণ্ঠ দুটি সিঙ্গল আর একটি ডাবল বেডেড ঘর নেয়। দুটি ঘরে নিবেদিতা ও ডিকে। ডাবল বেডের ঘরে তাঁরা দুই বন্ধু।

রাতের খাবারের অর্ডারও দিয়ে দেওয়া হয়।

ওকে, ঠিক আছে নিবেদিতা অ্যান্ড ধরণী? চারটে সিঙ্গল রুমই নেওয়া যেত – কিন্তু এতদিন পর আমাদের দেখা – একঘরে থেকে একটু গ্যাঁজাই – সুখদুঃখের গপ্পো করি – কী বলেন ?’

আপনাদের দুই পণ্ডিত মানুষের আড্ডায় অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ বুঝি ?’ ডিকে হেসে বলে।

পণ্ডিত! মাই গড! না, না, আমরা এখন সবাই মিলেই আড্ডা মারব – কী নিবেদিতা আপনি তো দেখছি কথাই বলছেন না – খান দ্যাখ, তোর বেদপুরাণের সঙ্গিনী আমায় মোটেই পছন্দ করছেন না –

আসলে ও একটু টায়ার্ড আছে আজ – নিবেদিতা তুমি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও –

কবীরের কণ্ঠে স্নেহ। নিবেদিতা ম্লান হাসে। কোনো কথা বলে না।

সব ঘর গুলোই দোতলায়। সকলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠে। পাশাপাশি তিনটি ঘর।

একটি সিঙ্গল রুমে ঢুকে যায় নিবেদিতা। দুই বন্ধুও তাদের ঘরে ঢোকেন।

ঘরে ব্যাগটা রেখে পেছনে টানা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় ডিকে।

সামনে ভাগীরথী। নদীর বুকে চলমান আলো দেখে বোঝে খেয়া পারাপার চলছে। ওপারে খোসবাগ। এপারটা লালবাগ।

বাংলাবিহারউড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লার মুর্শিদাবাদে এখন দাঁড়িয়ে সে।

সিগারেট ধরায়। গতকাল মাঝরাত থেকে রজতের ঠ্যালায় সেও দৌড়চ্ছে। ক্লান্তি তারও কম নয়। কিন্তু সে দৌড় তাকে অ্যাদ্দূর এনে ফেলবে – অভাবনীয়।

সিগারেটে গভীর টান পুরো ধোঁয়াটা নেয় ফুসফুসে। মাথাফাতা ঝিমঝিম করছে। একটা তোফা ঘুম দরকার।

হঠাৎ পায়ের আওয়াজ পেছনে তাকায়। নীলকণ্ঠ। মুখে হাসি।

কবীর টয়লেটে ঢুকেছে – তাই হোটেলটা একটু ঘুরেঘারে দেখছি –

আপনি আমার ঘরটা ইউজ করতে পারেন –হেসে বলে ডিকে।

আরে কবীর এক্ষুণি বেরিয়ে যাবে – অনেকক্ষণ ঢুকেছে – নিবেদিতা ওর ব্যাগ দিয়ে গেল , তারপর সেই যে টয়লেটে ঢুকল–

উনি আজ বেশ আপসেট – তাও দেখলাম আপনাকে দেখে মুড একটু ভালো হল – আসলে বিল্বদল চ্যাটার্জি এভাবে –

ওহ্‌, এই হল ভাগীরথী! মনে হচ্ছে এখনও পারাপার চলছে?’

ডিকের কথা যেন শোনেইনি এমন ভঙ্গিতে বলে নীলকণ্ঠ।

হুঁ।

ডিকেও তাকায় নদীর দিকে। ধোঁয়া ছাড়ে। নদীর ঠাণ্ডা হাওয়ায় ফেটে যায় সেই ধূম্রজাল।

আপনি কী করেন ধরণী?’ নীলকণ্ঠ চারপাশ দেখতে দেখতে প্রশ্ন ছোঁড়ে।

আমি সরকারী চাকরি করি। স্টেট গভর্নমেন্ট –

কবীরের সঙ্গে কোথায় আলাপ?’

কথা বলতে বলতেই ছাদে যাওয়ার একটা সিঁড়ি নজর টানে নীলকণ্ঠেরজরিপ করে নেয় দ্রুত।

ওনার লেখার সূত্রেই আলাপ – লিটল ম্যাগে ওনার লেখা পড়েই যোগাযোগ –

নিবেদিতা কী করেন?’

উনিও চাকরি করেন –

কোথায়?’

উনিও স্টেট গভর্নমেন্টেই আছেন –

আচ্ছা, আচ্ছা আপনারা দুজনেই তাহলে সরকারী কর্মচারী – আপনার বাড়ি কোথায় ?’

নিউ ব্যারাকপুর। সিগারেট চলবে?’ ডিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দেয়।

নো, থ্যাঙ্কস ভাই – কিছুদিন হল ছেড়েছি –

আপনি বাংলায় না থেকে হঠাৎ মহারাষ্ট্র চলে গেলেন কেন? অধ্যাপনা তো এখানেও করা যেত।ডিকের প্রশ্ন নীলকণ্ঠকে।

হ্যাঁ, করাই যেত – আসলে মাস্টার্সের পরে আমার কয়েক বছরের গ্যাপ ছিল – তারপর একটা কাজে বোম্বে যেতে হল – ওখানেই পিএইচডি করি – তবে আমি পুনে ইউনিভার্সিটির চাকরিটা রিসেন্টলি ছেড়েছি 

তাহলে এখন কোথায় আছেন?’ ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞাসা ডিকের।

মুম্বইএর একটা রিসার্চ ইন্সটিউটে জয়েন করেছি – আচ্ছা আসি – দেখি খান বেরলো কিনা –

নীলকণ্ঠের শ্লথ ভঙ্গিতে যাওয়াটা দেখে ডিকে।

নিবেদিতা সম্পর্কে নীলকণ্ঠের যাবতীয় প্রশ্নে ঠিক তথ্য দেওয়া অসম্ভব ছিল। কোথায় চাকরি করে – যদি বলত বিলুর কাগজে বা নিবেদিতা আসলে বিলুর সেক্রেটারি, তাহলে গুচ্ছ প্রশ্ন এসে ভীড় করত অযথা। নীলকণ্ঠকে এত কিছু বলবার কোনো মানে খুঁজে পায় না সে। সময় করে নিবেদিতাকে কেবল বলে দিতে হবে।

কিন্তু ডিকে বুঝতেও পারে না, নিবেদিতা সম্পর্কে তার দেয় তথ্য নীলকণ্ঠকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় – ডিকে মিথ্যে বলছে। কর্মস্থল তো জানেই, নিবেদিতার বাসস্থানও নীলকণ্ঠের অজানা নয়।

বস্তুত নিবেদিতার খোঁজ নিতেই সে ডিকের কাছে আসে, উদ্দেশ্যঃ ডিকেকে একটু বাজিয়ে দেখা সে সত্যি বলছে কিনা

কারণ ডিকে সম্পর্কেই তার কাছে কোনো তথ্য নেই। এটাই চিন্তার।

সামান্য অস্বস্তি নীলকণ্ঠের মাথায়ঃ নিবেদিতা কবীরকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় পালাচ্ছে – এই অনুমান হয়তো সত্য, কিন্তু সেখানে আরেকজন কে? ধরণী কয়াল! কে এই ভদ্রলোক?

ডিকের মিথ্যাভাষণ নীলকণ্ঠকে সতর্ক করে। নিজের মিথ্যাভাষণও তাই ঘুরিয়ে দেয় দ্রুত। পুনে ইউনিভার্সিটির ব্যাপারটা একটা ভুল। মিসটেক, মিসটেক! অনেকক্ষণ যাপন হয়ে গেছে এই অপরিচিতদের সঙ্গে। থাকতে হবে হয়ত আরও কিছুক্ষণ। কর্মক্ষেত্র নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতেই পারে। কবীরই তুলতে পারে। সুযোগ ষোলআনা। তাহলে অযথা ঝুঁকি কেন? তাই সংশোধন।

তবুও যা করার দ্রুত করতে হবে।

সময় কমছে ক্রমশ। ঝুঁকি বাড়ছে।

৯০

নিবেদিতা ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে। নিজের ব্যাগটা নিচে রেখে কবীরের ব্যাগটা রাখে চেয়ারে। দ্রুত খোলে চেন। পাণ্ডুলিপির প্যাকেটটা বার করে ঢোকায় নিজের ব্যাগে। তারপর অধুনা ব্যবহৃত মোবাইল সেটএ সিম পুরে সেটটাকে সাইলেন্ট মোডে আনে।

আসেপাশে তাকায়। ঘরের আনাচকানাচ বোলায় চোখ। বিছানার চাদরতোষক ওল্টায়। কাগজ চাই। না, নেই। নিজের ব্যাগটা দেখে। আছে। খবরের কাগজের একটা পাতা হলেই চলবে। ব্যারাকপুর স্টেশনে খাবার মুড়ে দিয়েছিল খবরের কাগজে।

ওটা দিয়েই মোবাইল সেটটা যত্ন করে মোড়ে। এমনভাবে যেন বোঝাই না যায় ভেতরে মোবাইল আছে। তারপর কবীরের ব্যাগের মধ্যে জামাকাপড়ের ভিড় পেরিয়ে একদম নিচে রেখে দেয় সেটটা।

দরজা খোলে। পাশে কবীরের ঘরে গিয়ে দিয়ে আসে ব্যাগটা। নীলকণ্ঠের মুখে মৃদু হাসি। কবীর চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন।

নিবেদিতা কবীরের শরীরের খবর নেয়। কবীর আশ্বস্ত করেন। নিবেদিতা বেরোয় ঘর থেকে।

না তাকিয়েই নারীনয়ন টের পায়, নীলকণ্ঠ তার আপাদমুণ্ডু নিরীক্ষণে।

নিজের ঘরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে।

ব্যাগ খুলে দেখে নেয় পাণ্ডুলিপির অবস্থান। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখে। তারপর ফ্যানটা ফুল স্পিডে করে বিছানায় বসে।

হাদীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফেলে দেয় শরীরটা। ফেব্রুয়ারিতেও এত গরম লাগছে! আগে একটা দারুণ স্নান চাই। নিশ্চয়ই গিজার আছে টয়লেটে।

নিবেদিতা শুয়ে শুয়েই জিন্‌স্‌টা খোলে। পা দিয়েই ছুঁড়ে দেয়। কিছুটা চেয়ারে কিছুটা মেঝেতে লুটিয়ে থাকে প্যান্টটা।

ঘুম তার দরকার নেই। ক্লান্তি যা ছিল ট্রেনে কিছুটা ঘুমিয়েই মোটামুটি গেছে। কিন্তু পাক খাচ্ছেই একটা টেনশন। কিছুতেই নীলকণ্ঠের উপস্থিতি স্বস্তি দিচ্ছে না। হতেই পারে স্যারের বা খানদার ক্লাসমেট, কিন্তু আজই কেন তার সঙ্গে দেখা হবে!

অ্যাতো নিঁখুত কাকতাল? কাক বা তাল, কারুরই কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই!

উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে। আয়নার কাছে যায়। লালকালো চেক ফুলস্লিভ শার্টটা পরল বহুদিন পর। বেরোবার সময় আলমারি খুলে দেখে ইচ্ছে হল, তাই ঢুকিয়ে নিয়েছিল। লেগেও গেল কাজে। শাদা চুড়িদারটা সত্যিই ঘামে লেপটে গিয়েছিল গায়ে। তাছাড়া পুলিশ চিনে পিছু নিতে পারল ওই পোষাকটার জন্যেই।

ভোলবদল সত্যিই দরকার ছিল। ভাগ্যিস ডিকেবাবু বললেন। লোকটা আশ্চর্য টাইপ। কখনও মনে হয় মহাধুরন্ধর, কখনও আবার ভোলেভালা। উনি কেন নীলকণ্ঠকে ক্লিন চিট দিচ্ছেন বোঝা যাচ্ছে না। আলাদা কথা বলতে হবে।

লালকালো চেক শর্ট শার্ট আর কালো প্যান্টি পরিহিত নিজেকে দেখে। কোথাও আলগা মেদ রাখতে দেয়নি। নিয়মিত ওয়ার্ক আউট আর মাপা ডায়েট। আয়নার সামনেই একটু ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করে নেয়।

বেশ খিদে পেয়েছে, কিন্তু তার আগে চান। না, তার আগে ছোট্ট একটা কাজ আছে। একটা না, দুটো কাজ। বাথরুমে ঢুকে চালিয়ে দেয় গিজার।

তারপর ঘরে এসে আবার ব্যাগ খোলে। বার করে ওয়েট টিস্যু পেপার আর ফেস ওয়াশ জেল। জেলটা রাখে টেবিলের ওপর। আয়নার কাছে গিয়ে ভেজা টিস্যু দিয়ে তুলে নেয় চোখের কাজল।

গোরার মুখটা ভেসে ওঠে। বেচারা কীভাবে আমায় সহ্য করে! নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে। ডিকেবাবু আবার বললেন, আজকের মধ্যে আমাদের খুঁজে না পেলে কাল গৌরাঙ্গের লাইফ হেল করে দেবে রজত রায়।

লোকটা সিম্পলি একটা গুণ্ডা। সব আইপিএস তো এমন নয়। ধরণী কয়ালের বন্ধু কীভাবে হতে পারে এমন লোক, জাস্ট ভাবা যায় না।

যোগাযোগ করারও উপায় নেই গোরার সঙ্গে। পুলিশ ওর ফোন অবশ্যই ট্যাপ করবে। নিবেদিতা ফোন করলেই দিব্যি তাদের লোকেশন জেনে যাবে পুলিশ। ও রাস্তায় এখন যাওয়া যাবে না।

তবে ফোনটা ডিকেবাবুকে দিয়েই করাতে হবে। গোরাকে নয়, রজত রায়কে। তারা যে ডাহা ভুল করছে এটা বুঝিয়ে বলা দরকার

কাজল তুলে ভেজা টিস্যু ফেলে বাস্কেটে। জিন্‌স্‌টা তুলে ঝেড়ে আলমারিতে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দেয়। জামাটা খোলে। ঝোলায়। বন্ধ করে আলমারি। আবার ব্যাগ খোলে। বার করে একটা শ্যাম্প্যুর স্যাশে।

স্যাশে আর ফেশ ওয়াশ জেলটা নিয়ে ঢুকে যায় বাথরুমে। এবার চান।

৯১

পলকে বিলুর খাস বেয়ারা নিমাইয়ের কথা মাথায় আসতেই রজত আরও উত্তেজিত।

নিমাই তার বয়ানে বলেছে, সাহেব শেষে বুড়ো আঙুল দেখাল আর নিনি করে কিছু বলতে চাইল। পারল না। চোখ দাঁড়িয়ে গেল। নিনি মানে ও বুঝেছে নিমাই। পারিজাতও বলেছে নিমাইকেই স্যার দেখতে পাচ্ছিলেন, তাই নিমাইয়ের নাম মুখে আনাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু রজত এখন ষোল আনার ওপর আঠেরো আনা নিশ্চিত বিলু মোটেই নিনি করে নিমাই বলতে চায়নি। নীলকণ্ঠ বলতে চেয়েছে। নিজের গলার দিকে আঙুল দেখিয়ে জল চায়নি। বোঝাতে চেয়েছিল নীলকণ্ঠ।

এই খটকাটাই ছিল যে একজন মৃত্যুপথযাত্রী আগডুমবাগডুম প্রচুর বকছে অথচ খুনিকে দেখা সত্ত্বেও খুনির নাম বলছে না! অবিশ্বাস্য! হতেই পারে না।

বিলু অবশ্যই জানত যে তার একদা ক্লাসমেটের অদ্বৈত নাম সকলে জানে না, নীলকণ্ঠ নামেই সে বেশি পরিচিত। তাই নীলকণ্ঠ নামটাই শেষে বলে যেতে চেয়েছিল।

বিধাননগর কমিশনারেট আর লালবাজারের একটা যৌথ টিম পাঠিয়ে দিয়েছে লালগোলার উদ্দেশ্যে।

অস্থির আগ্রহ নিয়ে নিজে অপেক্ষায় থাকে নদিয়া বা মুর্শিদাবাদ ডিআইবির কোনো সংবাদের। কিন্তু নিষ্কাম অপেক্ষা রজত রায় করতে পারে না। কামকাজ তার চাই।

গাড়ি বার করতে বলে। হাইল্যান্ড পার্ক।

নিবেদিতার বরবাবাজিকে একটু নিজেই বাজাতে হবে। কিছু না কিছু আওয়াজ তো বেরোবে। খবরের প্রতীক্ষার অবসরে এই কাজটাই খুঁজে নেয় রজত।

এতক্ষণ সময় ছিল না, এখন সময় যখন মিলেছে তখন হোক কিছুটা ভজ গৌরাঙ্গ।

৯২

স্নানটান সেরে ডিকে কবীরনীলকণ্ঠের ঘরেই চলে এসেছে। আড্ডা বসেছে জব্বর। মধ্যমণি অবশ্যই কবীর।

লক্ষ করার বিষয়, আড্ডায় নিবেদিতা নেই।

ঢোলা পাজামা আর পাঞ্জাবী। শাদা। গলায় কলারটি কিন্তু মাথায় আর টুপি নেই। নীলকণ্ঠ লাল মোল্ডেড চেয়ারে। ডিকেও। কেবল কবীর চাদর জড়িয়ে বিছানায়।

মুর্শিদকুলি খাঁ হিন্দু ঘরের সন্তান ছিলেন জানেন ধরণী?’ নীলকণ্ঠ হেসে তাকায় ডিকের দিকে।

শুনেছি, কিন্তু এটা গল্পগাথা না সত্যিসত্যি –

শোনা যায় উনি এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছিলেন, কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার পিতা শৈশবেই তাকে এক পারসিক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। এই শিশুই পরবর্তীকালে বড় হয়ে দেশে ফিরে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের খুব স্নেহভাজন হন। ঔরঙ্গজেব তাকে বাংলার নবাব করে পাঠান একসময় আর উপাধি দেন মুর্শিদকুলি খাঁ।ডিকের দিকে চেয়ে কবীরের সংযোজন।

ওনার নামেই তো মুর্শিদাবাদ নাম?’

আগে ছিল মুখসুদাবাদ। মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় এসে এখানকার নতুন নামকরণ করলেন – মুর্শিদাবাদ – একটা ট্যাঁকশালও চালু করলেন – শুরু হল মুর্শিদাবাদের কাহিনী – দেওয়ানি দফতর তখন ছিল ঢাকায়। ঢাকার নাম তখন জাহাঙ্গীরনগর। মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে দেওয়ানি দফতর মুর্শিদাবাদে ট্রান্সফার করেন। ফলে ঢাকা ছেড়ে আমলা বা অন্যান্য রাজকর্মচারীরা চলে আসেন মুর্শিদাবাদে। সবথেকে বড় ব্যাপার টাকার যোগান দিয়ে যারা সরকার চালাত অর্থাৎ ব্যাঙ্কাররাও চলে আসে মুর্শিদাবাদ। ফলে বিভিন্ন অফিসকাছারি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। মুর্শিদাবাদ কিছু দিনের মধ্যেই এক তিলোত্তমা নগরী বনে যায় – তবে মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি দফতর ট্রান্সফারের পেছনে অন্য একটা উদ্দেশ্য কাজ করেছিল – বড় উদ্দেশ্য –

ইতিহাসের কৃতিছাত্র নীলকণ্ঠ মুর্শিদাবাদ নগরীর অতীত গৌরবের কথা বলে যায়। নীলকণ্ঠের মুখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনে ডিকে। বস্তুত ভদ্রলোকের মিশুকে ব্যবহার, বাচনভঙ্গি কৃষ্ট করে তাকে

এদিকে ডিকেদের আড্ডা যখন রমরম, স্নান সারা হয় নিবেদিতার। শরীর কিছুটা শীতল হয় বটে কিন্তু সন্দেহকে দূর করতে পারে না।

স্নানটান করে চুলে তোয়ালে জড়িয়ে বেরোয়। হঠাৎকিছুমনেপড়েছে এই ভঙ্গিতে দ্রুত গলায় টপ আর র‍্যাপ অ্যারাউন্ড। ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ আর মোডেম বার করে বিছানায় রাখে। সিমটা ভরে। বসে যায় গুগল অনুসন্ধানে।

দ্রুত হাতে লিখতে চায় – পুনে ইউনিভার্সিটি । পুরোটা লিখতেও হয় না। অপশনে হাজির।

নিবেদিতা ক্লিক করে পুনে ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।

রজত ও তার পুলিশ বাহিনীর হাত থেকে অনেকটা দূর চলে আসায় ডিকে আপাতত নিশ্চিন্ত। কবীর ও তাঁর বন্ধু ইতিহাসবিদ নীলকণ্ঠকে পেয়ে তার পড়ুয়া সত্তা জাগ্রত।

মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি বদলি করার পেছনে অন্য কী উদ্দেশ্য আছে জানতে চায় ডিকে। তাকায় নীলকণ্ঠের দিকে।

কী উদ্দেশ্য ছিল?’

বিদেশী বণিকেরা তখন কাশিমবাজার, ফরাসডাঙ্গা বা চন্দননগরে কুঠি তৈরি করে লুঠপাটের বুনিয়াদ তৈরি করতে চাইছে – তাদের ওপর নজরদারি করার জন্য ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদই অনেক বেশি সুবিধাজনক –

নীলকণ্ঠ জবাব দেয়। কথার পিঠে কবীরও বলেন,

তাও আর আটকানো গেল কই? ঐ লুঠপাটের কোনো তুলনা হয় না। বাংলাকে ছিবড়ে বানিয়ে চলে গেল!’ কবীরের কণ্ঠে হতাশা।

ইংরেজ রাজত্বের আগে বাংলা, মূলত পূর্ববঙ্গকে তখন বলা হত এশিয়ার শস্য ভাণ্ডার। ১৯৪৭এর পরে তার অবস্থা ভাবুন ধরণী? কী এই বাংলা, কী ওপার বাংলা! খানের আক্ষেপ তো অক্ষরে অক্ষরে সত্যি!’

কী পরিমাণ ধনসম্পত্তি লুঠ করে ব্রিটিশরা নিয়ে গিয়েছিল – অচিন্তনীয় !’ আবার কবীর।

আর কেবল বাংলা কেন, গোটা ভারতবর্ষকেই বারে বারে লুঠ করেছে বিদেশিরা!’

নীলকণ্ঠের কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয় ডিকে। ইতিহাসের অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে এই বয়সেও নতুন রিসার্চের কাজে অদম্য উৎসাহ, তীব্র জ্ঞানতৃষ্ণারই পরিচয়। নীলকণ্ঠ আর বিলুই তাদের ক্লাসের সবচে ভাল ছাত্র – কবীরের দেওয়া সার্টিফিকেটও ডিকের নীলুতে মজে যাওয়ার কারণ। তার ওপর হাতে গরম ইতিহাস বীক্ষা। আগ্রহ না জন্মে পারে না তার

১০০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ৪০০ বছর ভারতবর্ষ ছিল ডাকাতি করার আদর্শ স্থান।নীলকণ্ঠের কথায় কবীরের যোগ।

তারা তো আর ইউরোপীয় ছিল না!’ নীলকণ্ঠের কণ্ঠে যেন হালকা শ্লেষ।

ইউরোপ তখন হামা দিচ্ছে – লুঠেরা হতে তার ঢের দেরি। তখন এসেছিল মূলত তুর্কিরা। ১০০০ খ্রীস্টাব্দে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিল সুলতান মামুদ। আফগানিস্তানের এক রাজ্য গজনীর সুলতান।

মোট ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেছিল মামুদ! উদ্দেশ্য লুঠপাট।নীলকণ্ঠ বলে।

ওই ৪০০ বছর ভারত ডাকাতির আদর্শ স্থান কেন বলছেন কবীরদা?’

ওই সময় ভারতে কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি বা শাসন ছিল না – অজস্র ছোট ছোট রাজ্য –

ডিকের প্রশ্নের উত্তর দেয় নীলকণ্ঠ। কবীর কিছুটা উত্তেজিত। বোঝা যায় তিনি আরও কিছু বলতে চান এই বিষয়ে।

থাকবে কী করে? মহাভারতে তো সবটাই লেখা আছে –

এখানে আবার মহাভারত আসছে কোত্থেকে?’

নীলকণ্ঠের কপট বিস্ময়। বিলুর কাছেই পেয়েছিল ইঙ্গিত। কথায় কথায় খান সেই প্রসঙ্গই তুলছে। সাবধানে তাই প্রশ্ন ছোঁড়ে নীলকণ্ঠ।

মহাভারতের কথা এমনি এমনি অমৃতসমান নয় রে নীলু! সব লেখা আছে।

কী রকম?’

কবীর শুরু করেন মহাভারতের কথা।

৯৩

মুর্শিদাবাদ ডিআইবির থেকে কোনো ইতিবাচক রিপোর্টই পায় না রজত।

শিট! খোলনলচে বদলাতে হবে! এইসব সেলগুলো আর আগের দক্ষতায় নেই। ফালতু মাল গ্যারাজ করার জায়গা হয়েছে। স্পেসিফিক রিপোর্ট দিলেও কোনো ইনফর্মেশন দিতে অক্ষম। অপদার্থ।

মনে মনে গালাগাল করতে করতে রজত নিবেদিতার ফ্ল্যাটের দরজার বেল টেপে। দরজা খোলে গৌরাঙ্গ। নিবেদিতার বর।

আসুন।গৌরাঙ্গ শুকনো হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা করে রজতকে।

কী করছেন একলা বাড়ি বসে, গৌরাঙ্গবাবু?’ রজত ঢুকতে ঢুকতে বলে।

গৌরাঙ্গ কোনো কথা বলে না। দরজা বন্ধ করে। রজত সোফায় গিয়ে বসে।

কিন্তু সে একজায়গায় বসে থাকার লোক নয়। পরক্ষণেই উঠে ঘরের চারদিকে দেখতে থাকে। গোটা ফ্ল্যাটটাই ঘুরে ঘুরে দেখে। গৌরাঙ্গ ফ্যালফ্যাল দাঁড়িয়ে।

বউ ফোনটোন করল?’

ন্‌নাহ্‌ –

আজকাল বাড়িতে বাড়িতে অনেক সিম – একটা কানেকশনে কী হয় ! অন্য নাম্বারগুলো চাই গৌরাঙ্গবাবু –

না মানে – অন্য নাম্বার তো নেই –

বাজে বকবেন না – আমি পুলিশ , আমাকে ভদ্রলোক ভাবলে মুশকিল! বলুন –

ডিভানে এসে বসে গৌরাঙ্গ। নিশ্চুপ। মাথা নিচু।

বলুন! আমার সময় নেই!’

আপনি ভুল বুঝছেন – নিবেদিতা সম্পূর্ণ নির্দোষ –

তাহলে সারেন্ডার করতে বলুন –

ও নির্দোষ – কবীর খানও –

পালাল কেন?’

কবীর খানকে বাঁচাতেই –

কবীরকে উনি বাঁচাবেন? কীভাবে? ‘

সেসব কথা হয়নি –

এটা কি হলিউডি মুভি আর উনি অ্যাঞ্জেলিনা জোলি? কবীরের যদি লাইফ রিস্ক থাকে সেটা উনি পুলিশকে জানালেন না কেন?’

কীভাবে বোঝাবো আপনাকে – আপনারা তো বুঝতেই চাইছেন না –

ফালতু গপ্পো দেবেন না –

কবীরদাকে খুনির হাত থেকে বাঁচাতে কেবল নয়, আপনাদের হাত থেকে বাঁচাতেও নিবেদিতা পালিয়েছে –

আমাদের?’

পুলিশ কবীরদাকে অ্যারেস্ট করা মানে কবীরদা ভিলেন – মিডিয়া সেভাবেই দেখাবে – কবীরদার ভাবনা আর

সামনে আসবে না –

ভাবনা?’

কবীরের ভাবনা আর নিবেদিতার উদ্দেশ্য রজতকে সবটা খুলে বলে গৌরাঙ্গ। ধৈর্য হারায় না রজত। সে বুঝে নিতে চায় সব। কিছুটা মরিয়া, কিছুটা উতলা গৌরাঙ্গ রজতকে বিস্তারে জানায়। রজত গম্ভীর।

উগ্রপন্থী সংগঠন এসএসএর লিডার এই কারণেই তাহলে কলকাতায়! কবীর আর তার মেন্টর বিল্বদলকে মেরে লোপাট করে দিতে চায় বিপজ্জনক পাণ্ডুলিপি। গৌরাঙ্গ যা বলছে, এই থিয়োরি মেনে নেওয়া সত্যি ওদের পক্ষে অসম্ভব।

প্রথম টার্গেট ছিল বিলু। শক্ত টার্গেট। সফল। মেন্টরকে মেরে কবীরকে হীনবল করে দিতে চেয়েছে।

পরবর্তী টার্গেট কবীর।

পুরনো ক্লাসমেটদের পেছনে ছোটার কারণ তাহলে এখানেই লুকিয়ে! উত্তর খুঁজে পায় রজত।

ফোনটা আবার কেঁপে ওঠে। সিপি কলিং। এবার কমিশনারসাহেব।

তিনি আবার কী খবর দেবেন?

৯৪

মহাভারতকথা বুঝতে গেলে সবার আগে বুঝতে হবে একজনকে। তিনি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। কে তিনি? মহাভারতকার হিসেবেই সবাই তাঁকে জানেন। ভাষাবিদরা গোটা মহাভারতের ভাষার স্বভাব বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছেন যে, ওই মহাকাব্য কমপক্ষে এক হাজার বছরের এক বিশাল সময়কাল ধরে লেখা।

এই ব্যাস কোনও একজন ব্যক্তি নয়, ব্রাহ্মণদের একটি সমিতি।

বই আকারে প্রকাশিত হতে চলেছে পত্রভারতী থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০১৭।  প্রকাশকের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষ দুইপর্ব চলে গেল কেবল বইয়ের পাতায়। পাঠক নিশ্চয়ই আমায় মার্জনা করবেন।

[বিন্দুবিসর্গ একটি ফিকশন। বিকল্প ভাবনার দার্শনিক কলিম খান ও তাঁর সহযোগী রবি চক্রবর্তীর গবেষণালব্ধ ভাবনার কিয়দংশ এই কাহিনীতে ব্যবহৃত। ভাষাতত্ত্ব ও ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তাঁদের বিকল্প ডিসকোর্স, এই কাহিনীর মূল উপজীব্য। উপন্যাসে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে মতের মিল অনেকের নাই হতে পারে, সেক্ষেত্রে পাঠকের কাছে একটাই অনুরোধ, লেখাটি একটি ফিকশন, কল্পিত কাহিনী হিসেবেই বিন্দুবিসর্গএর পাঠ কাঙ্ক্ষিত। অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাহিনী নির্মিত নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখিত হয়েছে কাহিনীর প্রয়োজনে। এই কাহিনীতে নির্মিত কাল্পনিক চরিত্র/গোষ্ঠী/মতবাদের সঙ্গে বাস্তবের কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতবাদের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলে তা নিতান্তই কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত। দেবতোষ দাশ]

বিন্দুবিসর্গ পর্ব ১৫

দেবতোষ দাশ

বই আকারে প্রকাশিত হতে চলেছে পত্রভারতী থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০১৭।  প্রকাশকের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বাকি পর্ব চলে গেল কেবল বইয়ের পাতায়। পাঠক নিশ্চয়ই আমায় মার্জনা করবেন।

[বিন্দুবিসর্গ একটি ফিকশন। বিকল্প ভাবনার দার্শনিক কলিম খান ও তাঁর সহযোগী রবি চক্রবর্তীর গবেষণালব্ধ ভাবনার কিয়দংশ এই কাহিনীতে ব্যবহৃত। ভাষাতত্ত্ব ও ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তাঁদের বিকল্প ডিসকোর্স, এই কাহিনীর মূল উপজীব্য। উপন্যাসে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে মতের মিল অনেকের নাই হতে পারে, সেক্ষেত্রে পাঠকের কাছে একটাই অনুরোধ, লেখাটি একটি ফিকশন, কল্পিত কাহিনী হিসেবেই বিন্দুবিসর্গএর পাঠ কাঙ্ক্ষিত। অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাহিনী নির্মিত নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখিত হয়েছে কাহিনীর প্রয়োজনে। এই কাহিনীতে নির্মিত কাল্পনিক চরিত্র/গোষ্ঠী/মতবাদের সঙ্গে বাস্তবের কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতবাদের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলে তা নিতান্তই কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত। দেবতোষ দাশ]

বিন্দুবিসর্গ পর্ব ১৪

বিন্দুবিসর্গ বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে পত্রভারতী থেকে কলকাতা বইমেলা ২০১৭য়।  প্রকাশকের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বাকি পর্ব চলে গেল কেবল বইয়ের পাতায়। পাঠক নিশ্চয়ই আমায় মার্জনা করবেন।

দেবতোষ দাশ।

.

বিন্দুবিসর্গ

                  বিন্দুবিসর্গ বই আকারে প্রকাশিত পত্রভারতী থেকে। প্রকাশকের ইচ্ছাকে               সম্মান জানিয়ে  শেষ পর্বগুলি চলে গেল কেবল বইয়ের পাতায়। দেবতোষ দাশ।